৭০ এ বিভ্রাট !!

ভারতের উপর হিন্দুস্তানের ছায়া যত দীর্ঘ হচ্ছে তত দেখছি বেশকিছু মানুষ সবেতেই “এরকম আগেও হয়েছে। কংগ্রেসও করেছিল। কংগ্রেসই শিখিয়েছে। অন্য দলগুলো কি ধোয়া তুলসীপাতা?” ইত্যাদি বলে সঙ্ঘ পরিবারের ঐতিহাসিক অপকর্মগুলোকে মান্যতা দিচ্ছেন। এমন নয় যে এঁরা সকলেই বিজেপিভক্ত। অনেকেই, অন্তত এখন পর্যন্ত, বিজেপিবিরোধী। সেই কারণেই এই গা বাঁচানো যুক্তিগুলো আরো ক্ষতিকর, আরো মারাত্মক। যাঁরা ভারত হিন্দুরাষ্ট্র হোক চান না এবং/অথবা মোদী সরকারের নিও লিবারাল অর্থনৈতিক নীতি কিভাবে দেশটাকে ভেতর থেকে ধসিয়ে দিচ্ছে তা দিব্যি টের পাচ্ছেন, তাঁরাও যদি এসব বলেন তার সোজা মানে হল মনে করছেন “যা হচ্ছে তাতে আমার কী?”
ভক্তকুলকে কিছু বলার নেই। কারণ প্রথমত, ভক্ত মানেই হল গুরু যদি বলে সূর্য আজ পশ্চিমে উঠেছিল তাহলে ভক্তও সেটাই বলবে। মোদীভক্ত, দিদিভক্ত — কেউই এর ব্যতিক্রম নয়। এই ধরণের যুক্তিবিহীন প্রজাতির সাথে তর্ক করা আর হাতিকে অন্তর্বাস পরানোর চেষ্টা করা একই কথা। ওতে শক্তিক্ষয় করতে যাব কেন? দ্বিতীয়ত, ভক্তদের সাথে দলীয় রাজনীতির পরিসরে বিতর্ক এবং তার বাইরে আমাদের মত ছাপোষা লোকেদের আড্ডায় তর্কাতর্কি করা আর সমীচীন মনে করছি না কারণ আগে ভক্তরা যা প্রস্তাব করত তা এখন কাজে করতে শুরু করেছে। অর্থাৎ সংখ্যালঘুবিদ্বেষের প্রচার, তাদের খুন করা, অতঃপর বনলতা সেনগিরি করা অর্থাৎ “এতদিন কোথায় ছিলেন?” (ইংরিজিতে যাকে বলে whataboutery) প্রশ্ন তুলে সেই খুনের পক্ষে যুক্তি খাড়া করা। এইসব লোক বাল্যবন্ধুই হোক, বর্তমান কি প্রাক্তন সহকর্মীই হোক আর পরমাত্মীয়ই হোক — মনুষ্যপদবাচ্য নয়। বুনো শুয়োরের সঙ্গে তো আর বিতর্কসভা বসানো যায় না। অতএব যা বলছি তা যাঁরা ভক্ত নন কিন্তু নিশ্চিন্ত হয়ে আছেন তাঁদের উদ্দেশেই বলছি।
ঠিক কথাই যে বিজেপি ২০১৪ য় ক্ষমতায় আসার পরে ভারতবর্ষে সংখ্যালঘু আর দলিতদের উপরে অত্যাচার শুরু হয়েছে, তার আগে অব্দি তারা সব নেচে নেচে ফুলে ফুলে মধু খেয়ে বেড়াচ্ছিল তা নয়। কিন্তু এটা অস্বীকার করার কোন উপায় নেই যে এই আক্রমণগুলোর পরিমাণ এবং সংগঠন ১৬ই মে, ২০১৪ থেকে অনেক বেড়েছে। তার চেয়েও বড় কথা সংখ্যালঘু বা দলিতদের উপরে আক্রমণ যে রাজনৈতিক এবং সামাজিক সমর্থন পাচ্ছে তা আগে কখনো পায়নি। ওড়িশায় বজরং দলের হাতে পাদ্রী গ্রাহাম স্টেইনস এবং তার দুই শিশুপুত্রের হত্যাকান্ড নিশ্চয় অনেকেরই মনে আছে। সেটাও হিন্দুত্ববাদীদের কীর্তি হলেও তখন কোন ক্ষমতাসীন নেতা মূল অপরাধী দারা সিংকে প্রকাশ্যে বাহবা দেওয়ার সাহস পায়নি। বাসে ট্রামে সাধারণ হিন্দুদের কাউকেও “দারা যা করেছে বেশ করেছে” বলতে শুনেছিলেন কি? আখলাক হত্যার বেলায় কিন্তু এক অভিযুক্ত ম্যালেরিয়ায় মারা যাওয়ার পর তার দেহ তেরঙ্গায় মুড়ে দেওয়া হয়েছিল। এক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী গিয়ে তাকে সশ্রদ্ধ প্রণাম জানিয়ে আসেন। সর্বোপরি এই যে বহুসংখ্যক সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায়ের মানুষ বৈঠকখানায় বসে পায়ের উপর পা তুলে বলছেন “মানুষ তো নানা কারণে মরেই” — এ জিনিস তখন হত না। যারা মনে করে পাদ্রীরা কেবল দারিদ্র্যের সুযোগ নিয়ে ধর্মান্তরকরণ করে বেড়ায়, তারাও স্টেইনস হত্যা ভাল হয়েছে বলত না চট করে। বিপজ্জনক বিগ ব্যাং পরিবর্তনটা এইখানে।
নরেন্দ্র মোদীর আমলে গণতন্ত্র আক্রান্ত বললেও অনেকে চরম উদাসীনতা নিয়ে কংগ্রেসই পথ দেখিয়েছে বলে টিভির চ্যানেল ঘুরিয়ে দিচ্ছেন। ঠিক কথা। সাংসদদের ঘুষ দিয়ে সরকার টিকিয়ে রাখা; বিধায়ক কিনে নিয়ে, নির্দল বিধায়ককে মুখ্যমন্ত্রী করে দিয়ে সংখ্যালঘু সরকারকে টিকিয়ে রাখা এসবে কংগ্রেস পুরনো খেলোয়াড়। কিন্তু দেশটা কি শুধু কংগ্রেস আর বিজেপির? ওরা ফুটবল খেলছে আর আপনি এইচ ডি টিভিতে মজা দেখছেন? ওদের খেলার ফলাফল আপনাকে ভোগ করতে হবে না? আপনি নিজের স্বরটাকে বন্ধক দিতে রাজি? আগে যা ছিল দলীয় রাজনীতির প্রতিহিংসা তা কিন্তু এই আমলে বাইরেও ছড়িয়ে পড়েছে। নইলে একটা বিশ্ববিদ্যালয়কে হেয় করা শাসক দলের কর্তব্য হয়ে দাঁড়ায় না, চত্বরে মিলিটারি ট্যাঙ্ক রাখা উপাচার্যের প্রস্তাব হয়ে ওঠে না। নরেন্দ্র মোদীর অবিসংবাদী জনপ্রিয়তা সত্ত্বেও যে যে রাজ্যে বিজেপি জয়ী হতে পারেনি সেখানেই অন্য কোন পার্টির নেতার অন্তরাত্মার উদয় — একেও আপনি স্বাভাবিক বলবেন? কদিন পরে যদি দেখা যায় মুকুল রায় সাংবাদিক সম্মেলন করে বলছেন “আমার অন্তরাত্মা আমায় জিজ্ঞেস করছে ‘দিদির জন্যে তো সারাজীবন এত করলাম। দিদি মানুষের জন্যে কী করলেন? অতএব আমি ছিন্নমূল কংগ্রেস গঠন করার সিদ্ধান্ত নিলাম।” বলে মমতার দলের বেশকিছু বিধায়ককে নিয়ে বাংলার মুখ্যমন্ত্রী হয়ে বসলেন। তখন কি মুকুলের সততার প্রশংসা করবেন? গণতন্ত্রে যে দলের বিশ্বাস আছে তারা পরবর্তী নির্বাচন অব্দি অপেক্ষা করতে পারছে না জয়ের জন্যে আর আপনি অপেক্ষা করছেন কবে আপনার বাড়ির কাউকে অকারণে সরকার গ্রেপ্তার করবে, তবে মানবেন গণতন্ত্র আক্রান্ত?
বিজেপির তাড়াটা কিসের জানেন তো? কিছুদিন আগে গোয়ায় কিছু হিন্দু সংগঠন একটা সম্মেলন করেছে যেখানে সিদ্ধান্ত হয়েছে ভারতকে ২০২৩ এর মধ্যে হিন্দুরাষ্ট্র করতে হবে। এখুনি বলবেন তো ওসব “ফ্রিঞ্জ এলিমেন্টস”, ওদের সাথে বিজেপির কী সম্পর্ক? সংবিধান অনুযায়ী আমরা ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র জানেন তো? তা দস্তুরমত সামিয়ানা খাটিয়ে, মাইক লাগিয়ে একটা সম্মেলন হল সংবিধানকে বুড়ো আঙুল দেখাতে অথচ একজনকেও গ্রেপ্তার করা হল না? মাওবাদীরা ধর্মতলায় মনুমেন্টের নীচে এরকম একখানা মিটিং করে বলুক দেখি “ভারতকে ২০২৬ এর মধ্যে একদলীয় সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পরিণত করব।” সবাই গ্রেপ্তার হবে, প্রতিরোধ করতে গেলে রক্তারক্তি কান্ড হবে। কিছু মুসলমান ধর্মীয় সংগঠন পার্ক সার্কাস ময়দানে একটা ময়দানে সভা করে বলুক তো “২০২৯ এর মধ্যে ভারতকে ইসলামিক রাষ্ট্রে পরিণত করব।” সরকার, পুলিশ কী করবে পরের কথা, আপনারই মনে হবে না আইসিস ঢুকে পড়েছে? তাহলে ঐ মিটিং বিজেপিশাসিত রাজ্যে দিব্যি ঘটে গেল কী করে? বিজেপি এসবের সাথে জড়িত নয়? তার চেয়ে বলুন না “তেলও যা জলও তাই”। বেশি বিশ্বাসযোগ্য হবে।
আপনি ভয়ে বা সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের মানুষ হওয়ার নির্ভয়ে “আগেও হয়েছে” বলে পাশ ফিরে শোন কিন্তু মনে রাখবেন এ বড় বিচিত্র দেশ। এখানে কোথাও না কোথাও সবাই সংখ্যালঘু। আপনার বাড়ির যে ছেলে বা মেয়ে ব্যাঙ্গালোরে কর্মরত, সে হিন্দু বামুন, কায়েতের সন্তান হলেও ওখানে বহিরাগত তথা ভাষার দিক থেকে সংখ্যালঘু। বড়বাজারের গদিতে বসা বিশালকায় মারোয়াড়ি ব্যবসায়ী আবার এখানে জাতিগতভাবে, ভাষাগতভাবে সংখ্যালঘু। কিন্তু আপনি বাঙালি ক্রেতা, যতক্ষণ ওপাড়ায় আছেন ততক্ষণ সংখ্যালঘু। এই যে আমরা বুক চিতিয়ে এসব অঙ্ক না কষেই চলেফিরে বেড়াচ্ছি এতবড় দেশটা জুড়ে, সেটা সম্ভব হয়েছে হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্তান তত্ত্বটাকে ১৯৪৭ এ আস্তাকুঁড়ে ছুঁড়ে ফেলা হয়েছিল বলে। গণতন্ত্র থাকলে তবেই দেশটা আছে, রাষ্ট্রের কোন ধর্ম না থাকলে তবেই ভারত আছে। ভাববেন না আপনি বাঙালি হয়ে হিন্দু বলে বেঁচে যাবেন। আপনার কবিকে নিয়ে টানাটানি হয়েছে সবে। হিন্দিভাষী হতে না চাইলে এরপর আপনাকেও ছবি করে দেওয়ার প্রকল্প আসবে। আসবেই।
সৈনিকরা সীমান্তে মরছে আর আমরা এসব তর্ক করছি? হ্যাঁ করছি। কারণ যতক্ষণ সৈনিকরা সীমান্তে আছে ততক্ষণই ভারত আছে, ওরা পার্লামেন্টে, রাষ্ট্রপতি ভবনে ঢুকে পড়লে আর ভারত থাকবে না। কী বলছেন? এরকম কখনো হয়নি? ঠিক। হয়নি বলেই ভারত আছে। নইলে হিন্দুস্তান থাকত। ওটা কিসের সাথে রাইম করে বলুন তো? পাকিস্তানের সাথে। আমাদের সাথে ওদের স্বাধীনতারও সত্তর হল।