ভারত ছাড়ো আন্দোলন : সংঘের বৃহত্তম অবদান

দেবমাল্য ঘোষ 

Translated by : Hutom Pecha

আগামী ৮ই আগস্ট ভারত ছাড়ো আন্দোলনের ৭৫ বছর পূর্ণ হবে। ভারত ছাড়ো আন্দোলন ব্যাপারটা যে কী, খায় না মাথায় দেয়, আজকের তরুণ প্রজন্মের অনেকের কাছেই হয়ত সেটা পরিষ্কার নয়। মহাত্মা গান্ধী, যিনি এই আন্দোলনের ডাক দিয়েছিলেন, তাঁর মতাদর্শও আজকাল অনেকের কাছেই অজানা।

গান্ধী বোধহয় এমন একটা নামে পরিণত হয়েছেন, যা একবার জপে নিলে যে কোন রাজনীতিবিদের যে কোন পাপ ধুয়ে যায়। যখন নরেন্দ্র মোদীকে দেখি মহাত্মার নাম করে দেশবাসীকে ভারত ছাড়ো আন্দোলনের বর্ষপূর্তি উদযাপন করতে বলছেন, তখন অবাক হয়ে ভাবি তিনি হঠাৎ মহাত্মার মহত্ত্ব আবিষ্কার করলেন কবে! মোদীজির তো ঘোষিত লক্ষ্য হল কংগ্রেসমুক্ত ভারত। তাহলে গান্ধীর নেতৃত্বে কংগ্রেস এককভাবে যে আন্দোলনের ডাক দিয়েছিল তার প্ল্যাটিনামজয়ন্তী উদযাপনে এত উৎসাহ কিসের? বিজেপির মাইবাপ হল আর এস এস, যার নেতাদের মোদীজি গুরুর আসনে স্থান দেন। সেই আর এস এসের গোলওয়ালকর, সাভারকর, শ্যামাপ্রসাদ শুধু ভারত ছাড়ো আন্দোলনের বিরোধিতাই করেননি, আন্দোলন দমন করতে ইংরেজ সরকারকে সাহায্যও করেছিলেন। একদিকে এই লোকগুলোর প্রতি অচলা ভক্তি আর অন্যদিকে মহাত্মা গান্ধীর প্রতি শ্রদ্ধা বজায় রাখা কী করে সম্ভব? দেখা যাক, ইতিহাস ঘাঁটলে এর উত্তর মেলে কিনা।

১৯৪২ সালের মার্চ মাসে ইংরেজ সরকার স্যার স্ট্যাফোর্ড ক্রিপসের নেতৃত্বাধীন এক প্রতিনিধিদলকে ভারতে পাঠায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ভারতের সমর্থন নিশ্চিত করতে এবং বিনিময়ে যুদ্ধের পরে স্বায়ত্তশাসনের অধিকার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে। মহাত্মা গান্ধী তথা কংগ্রেস এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। পূর্ণ স্বরাজ ছাড়া কোনকিছু মেনে নিতে তাঁরা অস্বীকার করেন। সেবছর মে মাসে গান্ধী সরকারকে বলেন “Leave India to God. If that is too much then leave her to anarchy” (ভারতবর্ষকে ঈশ্বরের হাতে ছেড়ে দিন। যদি তা অসম্ভব হয় তাহলে নৈরাজ্যের হাতে ছেড়ে দিন)। এরপর ৭ই আগস্ট তৎকালীন বোম্বাইয়ের গোওয়ালিয়া ট্যাঙ্ক ময়দানের কংগ্রেস অধিবেশন থেকে তিনি ভারত ছাড়ো আন্দোলনের ডাক দেন। তিনি বলেন “Here is a mantra, a short one that I give you. You may imprint it on your hearts and let every breath of yours give expression to it. The mantra is ‘Do or die’. We shall either free India or die in the attempt; we shall not live to see the perpetuation of slavery” (আমি আপনাদের একটা ছোট্ট মন্ত্র দিচ্ছি। মন্ত্রটা আপনারা হৃদয়ে খোদাই করে নিতে পারেন এবং প্রত্যেক শ্বাসপ্রশ্বাসে আওড়াতে পারেন। করব অথবা মরব। হয় আমরা ভারতকে স্বাধীন করব অথবা সেই প্রচেষ্টায় মৃত্যুবরণ করব। দাসত্বকে দীর্ঘায়িত করতে বেঁচে থাকব না)।

গান্ধীর ডাকে সমস্ত স্তরের মানুষ এই আন্দোলনে যোগ দেয়। সরকার কিন্তু আগে থেকেই তৈরি ছিল। ভাইসরয় লিনলিথগোর ৮ই আগস্ট ১৯৪৬ তারিখের চিঠি প্রমাণ করে সরকার আন্দোলনটা নিয়ে কিরকম আশঙ্কিত ছিল “I feel very strongly that the only possible answer to a declaration of war by any section of Congress in the present circumstances must be a declared determination to crush the organisation as a whole” (আমার দৃঢ় বিশ্বাস এই মুহূর্তে কংগ্রেসের যে কোন অংশের যুদ্ধঘোষণার একমাত্র উত্তর হল পুরো সংগঠনটাকেই নির্মমভাবে ধ্বংস করা)। এই কারণেই গান্ধীর ঐতিহাসিক বক্তৃতার কয়েকঘন্টার মধ্যেই কংগ্রেসের প্রায় সব নেতাকে জেলে পুরে দেওয়া হয়। গান্ধীকে গ্রেপ্তার করা হয় ৯ই আগস্ট ভোরে। ভারত ছাড়ো আন্দোলন চলাকালীন সারা দেশজুড়ে যে দমনপীড়ন চালায় সরকার, তার প্রতিবাদে ১০ই ফেব্রুয়ারী ১৯৪৩ থেকে তিনি ২১ দিনের অনশন শুরু করেন।

রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ, হিন্দু মহাসভা আর মুসলিম লিগ ভারত ছাড়ো আন্দোলনের সময়ে কী করছিল সেটা এবার দেখা যাক।

বিনায়ক দামোদর (তথাকথিত বীর) সাভারকরের অধীন হিন্দু মহাসভা ব্রিটিশ সরকারের সাথে সহযোগিতা করার সিদ্ধান্ত নেয়। ৪২ এর আগস্টেই কানপুরিনে হিন্দু মহাসভার ৪২তম অধিবেশনে সাভারকর বলেন “The Hindu Mahasabha holds that the leading principle of all practical politics is the policy of responsive co-operation. And in virtue of it, it believes that all those Hindu Sangathanists who are working as councillors, ministers, legislators, and conducting any municipal or any public bodies with a view to utilize those centres of government power to safeguard and even promote the legitimate interests of the Hindus without, of course, encroaching on the legitimate interests of others are rendering a highly patriotic service to our nation” (হিন্দু মহাসভা মনে করে সমস্ত বাস্তববাদী রাজনীতির মূলনীতি হল পরিস্থিতি অনুযায়ী সহযোগিতার কৌশল নেওয়া। সুতরাং আমাদের সংগঠনের যেসব সদস্য কাউন্সিলার, মন্ত্রী, আইনপ্রণেতার ভূমিকা পালন করছেন বা কোন পৌরসভা অথবা অন্য সরকারী প্রতিষ্ঠান চালিয়ে হিন্দুদের স্বার্থরক্ষা করছেন অন্যদের স্বার্থে হস্তক্ষেপ না করে, তাঁরা প্রকৃত দেশপ্রেমিকের কাজই করছেন)। সমগ্র সাভারকর ওয়াংমায়া : হিন্দু রাষ্ট্র দর্শন, ষষ্ঠ খন্ডে এই বক্তৃতাটা পাওয়া যায়। নিজের চোখে দেখে নিতে পারেন।

সাভারকরের এই বক্তৃতার পরেই হিন্দু মহাসভা মুসলিম লিগের সঙ্গে জোট সরকার গঠন করে সিন্ধ আর নর্থ ওয়েস্ট ফ্রন্টিয়ার প্রভিন্সে । মনে রাখবেন — মুসলিম লিগ, যারা ততদিনে পাকিস্তানের দাবি তুলে ফেলেছে। আর সেই জোট সরকারের উপমুখ্যমন্ত্রী হিসাবে যোগ দেন কে? শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। এই শ্যামাপ্রসাদই জনসঙ্ঘের জন্মদাতা, যা পরে ভারতীয় জনতা পার্টিতে পরিণত হয়। ভদ্রলোক হিন্দু মহাসভা আর মুসলিম লিগের পক্ষ থেকে এক চিঠিতে ভারত সরকারকে লেখেন “Let me now refer to the situation that may be created in the province as a result of any widespread movement launched by the Congress. Anybody, who during the war, plans to stir up mass feeling, resulting in internal disturbances or insecurity, must be resisted by any Government that may function for the time being” (Leaves from a diary. Oxford University Press, p. 179) (বিস্তীর্ণ এলাকায় ছড়িয়ে পড়া কংগ্রেসের আন্দোলনের ফলে এই প্রদেশে যে পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে সে সম্পর্কে এবারে বলি। সরকারের উচিৎ যে কোন লোক, যে যুদ্ধ চলাকালীন জনগণকে ক্ষেপিয়ে তুলে আভ্যন্তরীণ অশান্তি বা নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করার পরিকল্পনা করে, তাকে আটকানো)।

গভর্নরকে লেখা এক চিঠিতে ছিল “প্রশ্ন হল বাংলায় এই আন্দোলনের বিরুদ্ধে (ভারত ছাড়ো) কিভাবে লড়া হবে। প্রশাসন এমনভাবে চালানো দরকার যাতে কংগ্রেসের হাজার চেষ্টা সত্ত্বেও এই প্রদেশে শেকড় ছড়াতে না পারে। আমাদের, বিশেষ করে দায়িত্বশীল মন্ত্রীদের, জনগণকে একথা বলতে পারা উচিৎ যে কংগ্রেস যে স্বাধীনতার দাবিতে ভারত ছাড়ো আন্দোলন শুরু করেছে, জনপ্রতিনিধিদের সেই স্বাধীনতা ইতিমধ্যেই দেওয়া হয়েছে। তবে হয়ত কিছু কিছু ক্ষেত্রে সেই স্বাধীনতা জরুরী অবস্থার কারণে সীমায়িত করা হয়েছে। ভারতীয়দের উচিৎ ব্রিটিশদের বিশ্বাস করা। ব্রিটেনের ভালর জন্যে নয়, এই প্রদেশের সুরক্ষা এবং স্বাধীনতা বজায় রাখার জন্যেই। গভর্নর হিসাবে আপনি এই প্রদেশের সাংবিধানিক প্রধানসুলভ কাজই করবেন এবং সম্পূর্ণভাবে আপনার মন্ত্রীদের পরামর্শ অনুযায়ী চলবেন” (The RSS and the BJP: A Division of Labour. LeftWord Books. pp. 56–57)

সঙ্ঘের ‘গুরুজি’ গোলওয়ালকরও ব্রিটিশ শাসনের সমর্থক ছিলেন। ভারত ছাড়ো আন্দোলন শুরু হওয়ার দেড়বছর পর বোম্বাই সরকার এক মেমোতে পরম সন্তোষে লেখে “সঙ্ঘ নিজেকে সচেতনভাবে আইনের আওতার মধ্যে রেখেছে। বিশেষ করে ১৯৪২ এর আগস্টে শুরু হওয়া অশান্তিতে একেবারেই অংশগ্রহণ করেনি” (From Plassey to Partition: A History of Modern India By Śekhara Bandyopādhyāẏa. Pg 422 ).

এখানেই শেষ নয়। ভারতরত্ন অটলবিহারী বাজপেয়ী আর তাঁর দাদা প্রেমবিহারী — দুজনেই ইংরেজ পুলিশের কাছে মুচলেকা দেন, যার ফলে কাকুয়া ওরফে লীলাধর নামে এক স্বাধীনতা সংগ্রামীকে পুলিশ গ্রেপ্তার করতে সমর্থ হয়। বিশ্বাস হচ্ছে না? তাহলে ফ্রন্টলাইন পত্রিকার এই অন্তর্তদন্তটা পড়ে দেখুন http://www.frontline.in/static/html/fl1503/15031220.htm.

জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য সম্প্রতি যে বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে মিলিটারি ট্যাঙ্ক রাখতে বলেছেন বা স্মৃতি ইরানি যে মানবসম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রী থাকাকালীন সমস্ত বিশ্ববিদ্যালয়কে তেরঙ্গা ওড়ানোর আদেশ দিয়েছিলেন, সেসবই আসলে এইসব ইতিহাস চেপে রাখার চেষ্টা। মোদীর ভারত ছাড়ো আন্দোলনের প্রতি গদগদ আবেগও একই কারণে। সেই যে কথাটা আছে না? “ঠাকুরঘরে কে রে? আমি তো কলা খাইনি।“

Where was the RSS when the freedom struggle was on?  : https://www.youtube.com/watch?v=M5sW7z3oymE

 

Photo Courtesy