রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এর ” না “

হুতোম প্যাঁচা

বাঙালীর বারো মাসে তেরো পার্বন সেই আমাদের আমল থেকে চলে আসচে। কিন্তু এতদিন পরে মর্ত্যে এসে এত নতুন নতুন মোচ্ছব দেখচি যে তাজ্জব লাগচে। রামের জন্যে অমন মিছিল দেখে ভাবলেম এর চেয়ে আজব জিনিস আর পাব না। ল্যাপটপটা গোলমাল কচ্চিল, তাই অভিজিৎকে ফোন কল্লেম। কথায় কথায় একথা বলতে সে বল্লে “কী বলছেন? বাঙালীর সবচেয়ে বড় উৎসবটাই তো এখনো আসেনি।“

আমি বল্লেম “তুই থাম। কিচ্ছু খবর রাখিসনে। রামনবমীর খবরটা তো ঐ কবিটাকে পাহারা দিতে গেলি বলে পেলি। আগে তো টেরও পাসনি।“

ছোকরা বল্লে “আরে এবারে ভুল বলছি না, দাদা। বিশ্বাস কর।“

আমি শুধোলেম “কী উৎসব?” সে বল্লে “রবীন্দ্রজয়ন্তী।“

তা রবীন্দ্রজয়ন্তী আমার কাছে নূতন ব্যাপার কিচু নয়। সেই ১৯৪২ থেকে আমাদের নরকেও হয়ে আসচে। দেবেন ঠাকুরের ছোট ছেলে যে বাপের চেয়েও বড় হয়েচে তার আগে আমার জানা ছিল না। যতদিন যাচ্চে আমাদের রবীন্দ্রজয়ন্তীর জলুস বেড়েই চলেচে। আমার মন্দ লাগে না। গানে বাজনায় দিব্য কাটে কয়েকদিন। মানে ঐ রিহার্সাল ধরে বলচি আর কি। আমার খেয়ালই ছিল না এটা বোশেখ মাস, অভিজিৎ বলায় মনে পল্ল। তাই বল্লেম “আমাদের ওদিককার রবীন্দ্রজয়ন্তীর তোড়জোড় কেমন হচ্চে রে?”

সে বল্লে “আমি এখন হেবি ব্যস্ত। বিবেকানন্দের সাথে হিন্দুধর্ম নিয়ে বিতর্ক আছে। তারজন্যে পড়াশোনা করছি। তাই আর খোঁজ নেয়া হয়নি। চাইলে নিজেই একবার ঘুরে যাও না।“

আমি দেখলেম তা একবার ঘুরে এলে হয়। দিনের দিন তো এবারে মর্ত্যেই থাকতে হবে, নইলে পরের নকশায় লিখব কী? তুরিয়ম সম্পাদকমশায়ের হাতযশে রামনবমীর নকশা কিছু লোক পড়েচে, পেত্থমটির মত না হোমে না যজ্ঞে অবস্থা হয়নি। এখন পরেরটা লিখতে বেশি দেরি কল্লে আবার যদি পাঠক না জোটে! তখন সম্পাদকও খাতির করবেন না। তাই নরকে গেলেম একদিন রিহার্সাল দেখতে।

ও মা! এ কি অবস্থা! কোথায় কি? রিহার্সালের ঘরে যেয়ে দেখি এক কোনায় শান্তিদেব, মোহর আর সুচিত্রাকে নিয়ে শুকনো মুখে বসে আচে; তানপুরা, তবলা, হারমোনিয়াম সব অযত্নে গড়াগড়ি যাচ্চে। আরেক কোণে শম্ভু দেয়ালে পিঠ দিয়ে মর্ত্যের দিকে তাকিয়ে কি যেন ভাবচে, তৃপ্তিরও মুখ চুন। আর রবিকে তো ত্রিসীমানায় দেখলেম না। প্রতিবার রিহার্সালে সে নিজে উপস্থিত থাকে। আমি শম্ভুকে গিয়ে শুধোলেম “ব্যাপারখানা কি রে? তোরা রিহার্সাল দিচ্চিস না? রবিই বা কোথায়?” তার মুখ দেখে বুঝলেম উত্তর দেয়ার কোন ইচ্ছেই ছিল না, নেহাত আমি বয়োজ্যেষ্ঠ তাই বল্লে “এবারে রবীন্দ্রজয়ন্তী হবে না।“

“কেন?”

ও কোণ থেকে শান্তিদেব বল্লে “গুরুদেবের ইচ্ছে নয়। কেন তা তিনি বলেননি। আপনি তো তাঁরও বড়। একবার কথা বলে দেখুন না, হুতোমবাবু?”

আর্জিটি যথার্থ। আমি রবির বাপের আমলের লোকই বটে, যদিও দেবেন ঠাকুর আমার চেয়ে ঢের বড়। রবি আমায় মান্যিগণ্যিও করে ভালই। যখন থেকে নরকে এসেচে, হাসি গানে সে আমাদের মাতিয়ে রেখেচে। কী এমন তার হল যে জম্মদিন পালনে অরুচি? আমি বেরোলেম রবির সন্ধানে।

খুঁজতে খুঁজতে শেষে বিষসাগরের পাড়ে দেখা পেলেম। মনটা যে তার ভাল নেই সে পরিষ্কারই বোঝা গেল। দেখি মাথা নীচু করে গান শুনচে। জর্জ পায়ের কাছে বসে গাইচে “তোমার কথা হেথা কেহ তো বলে না/মিছে করে শুধু কোলাহল।“ একটু দূরে ঋত্বিক বসে আচে চশমাটা কপালের উপর তুলে, হাতে বাংলার বোতলটা পর্যন্ত নাই। শিব্রাম, আরেক প্রতিভাবান ক্ষ্যাপা, সে-ও দেখি ওখানে উপস্থিত। তাকে দেখতে পাওয়া ভাগ্যের কথা। সে যে কখন কোথায় টোটো করে ঘুরে বেড়ায়, একমাত্র মা কালীই একটুআধটু জানতে পারেন। সকলেরই মুখ ভার, শুধু শিব্রামেরই দেখি ঠোঁটের কোণে হাসি লেগে আচে।

জর্জের গান একবার কানে গেলে আর নত্তে চত্তে পারা যায় না। আমিও চুপটি করে দাঁড়িয়ে শুনলেম গোটাটা। শেষ হয়েচে সবে, রবির চোখ পড়েচে আমার উপর।

“হুতোমবাবু? এসো। বসো।“

আমি বসলেম। সোজা কাজের কথায়। “কী ব্যাপার, রবি? হয়েচে কি? এবারে নাকি বলেচিস রবীন্দ্রজয়ন্তী না কত্তে?”

“হ্যাঁ। মর্ত্যে যা হবে হোক, ওতে তো আমার হাত নেই। অন্তত এখানে বন্ধ হলে আমার একটু কম খারাপ লাগবে,” সে বল্লে।

“কিন্তু কেন?”

“মর্ত্যে আমার নাম করে যা চলছে, হুতোমবাবু। আমি যা লিখেছি, করেছি সবই তো মানুষের জন্যে। স্বর্গ, নরকে যারা থাকে তাদের জন্যে তো নয়। যাদের জন্যে সব তারাই যখন মর্ম বুঝছে না তখন ওসব জন্মদিনটিন করে আর কাজ নেই। মর্ত্যের অনুষ্ঠানগুলোও বন্ধ করে দিতে পারলে ভাল হত। যত্ত ভন্ডামি।“

আমার মনে পড়ল সেদিন দেখেচি বটে রবির নামে একখানা খেউড়। আমি মিলেনিয়াম পার্কের বেঞ্চিতে বসে গঙ্গার হাওয়া খাচ্চিলেম। আমি কাউকে দেখা দিয়ে ভয়টয় দেখাইনে। কচি ছেলেমেয়েদের জন্যে একটু জায়গা ছেড়েই বসি। তা দুটিতে ঐ বেঞ্চে বসেচিল। আড়ি পাততে যাইনি কিন্তু রবির নামটা কানে আসায় কান খাড়া করতেই হল। দেখি দুজনে হাতের ফোনে কিসব দেখচে। আমিও দেখলেম। দেখি এক মেমের সাথে রবির ছবি।rabindra-1 মেমের আঙুলগুলো রবির ঠোঁটে। রবির কাছে এই ছবিখানা আমার দেখা ছিল। মেমটির নাম হেলেন কেলার। বেচারি অন্ধ, তার উপর বোবাকালা। কিন্তু মহীয়সী। রবির সাথে একবার দেখা হয়েচিল। তখন সে কথা বলেছিল রবির ঠোঁটে হাত বুলিয়ে। ঐ ছোকরার ফোনে দেখি ছবিটার উপরে কোন্ অপোগণ্ড লিখেচে রবি কতবড় লম্পট এইটেই তার প্রমাণ। তাই নিয়ে ছেলেমেয়ে দুটির কি হাসি! দেখে আমার এমনি রাগ হয়েচিল যে তাদের মাথাদুটি দিয়েচিলেম ঠুকে। কিন্তু ঐসব মূর্খের দাপানিতে কিনা রবি আহত! এ বা কি কথা?

 

রবি বল্লে “তা নয়, হুতোমবাবু। ওসবে আমার কিছু এসে যায় না। আমি বেঁচে থাকতেও আমার নামে কতজনে কত কি বলেছে। আমি বড়লোক বাপের ছেলে, শান্তিনিকেতনে মহিলাদের নিয়ে রসেবশে থাকি এসবও বলেছে। তাতে কি আমি রাগ করেছি? কাজ করলেই নিন্দে হবে, এই আমি চিরকাল জেনে এসেছি।“

আমি বল্লেম “বটেই তো। নইলে বিদ্যাসাগরমশায়ের মত মানুষের অত শত্রু হয়?”

“সেই। কিন্তু এবারে আমার অন্য জায়গায় বেজেছে। এ আমি মানতে পারব না। তুমি আমায় অনুরোধ করবে না।“

“আরে সেইটেই তো জানতে চাইচি। বল্ না কি ব্যাপার।“

রবি চারপাশটা একবার দেখে নিলে, তারপর জর্জকে নীচু গলায় শুধোলে “হ্যাঁ গো, কাজী আশেপাশে নেই তো? বারেবারে এসব কথা তার কানে যাওয়া ভাল না।“

জর্জ অভয় দিলে “কাজীদা এখন এইদিকে আইব না। সকালে কইল কি একখান শ্যামাসঙ্গীত লিখসে, সুরটা কিছুতেই মনোমত হইতাসে না। ঐ নিয়াই বুঁদ হইয়া আসে।“

রবি যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলে। তারপর বল্লে “তুমি জানো, মর্ত্যের বাঙালিরা আজকাল বলাবলি করছে আমি হিন্দু কবি আর কাজি হল মুসলমান কবি!Nazrul_as_Narad স্বর্গ থেকেও কারা সব এসে নাকি ওসব বলে গেছে কাজিকে! ভাবতে পার! আমি তো বিশ্বাসই করিনি। তারপর ঐ অভিজিৎ, অনন্ত ওদের জিজ্ঞেস করলাম। অনন্তর কম্পিউটারে ওরা আমায় দেখাল — কথাটা সত্যি। তুমি বল, হুতোমবাবু। এরপরে আমার জন্মদিন পালন করবে এরা? আমি হিন্দু কবি? মুসলমান বাঙালি আমার কেউ নয়? আমার স্নেহের কাজী, আমাদের বাংলার কাজী, ও হল মুসলমান কবি? হিন্দু বাঙালির ও কেউ হয় না? ছি ছি ছি। এ লজ্জা আমি রাখব কোথায়? এই বাঙালি আমায় ২৫শে বৈশাখ পুজো করবে আর সে পুজো আমি নেব?”

এই বাঁদরামিটা আমার জানা ছিল না। দেখলেম রেগে যাওয়ার মত ব্যাপারই বটে। রবি বল্লে “আরো শুনবে? এদের পলিটিক্স কোথায় নেমেছে! ঐ ঋত্বিকের কাছে শোন।“

“কি আর বলব,” ঋত্বিক বল্লে। “সেদিন এক যমদূত আমার বাংলার বোতল আনতে গিয়ে শুনে এসেছে এক শুয়ার পাবলিক মিটিং এ বলছে ‘রভিন্দরনাথ’ নাকি সারাজীবন হিন্দুদের জন্য গান, কবিতা লিখেছেন। হিন্দুদের জন্যে কাজ করেছেন, হিন্দু জাতীয়তাবাদী ছিলেন, ঐজন্যে জাতীয় সঙ্গীত লিখেছেন। শালা। বাংলার মাটিতে দাঁড়িয়ে এইসব বলেছে আর লোকে হাঁ করে শুনেছে। ইনক্রেডিবল বাস্টার্ডস।“

শুনে আমি আর রা কাড়তে পারিনে। এসবের পরে আর রবিকে বলা যায় ঢাকঢোল পিটে রবীন্দ্রজয়ন্তী কত্তে?

শিব্রাম এতক্ষণ একটিও কথা বলেনি। এবারে একগাল হেসে বল্লে “অপরাধ নেবেন না, গুরুদেব। কিন্তু এর পেছনে আপনারও হাত আছে।“

ছোকরা বলে কি! বলেই চল্লে “বিশ্বাস হচ্ছে না তো? কিন্তু আপনি যা করে এসেছেন, এ হওয়ারই ছিল।“

রবি অনেক কষ্টে শুধোলে “কেন?”

“একটি সঙ্ঘ বানিয়ে এসেছেন যে। আমি অনেকদিন আগেই বলেছিলাম, সঙ্ঘ মানেই সাঙ্ঘাতিক। আপনি যখন থেকে সঙ্ঘ বানিয়েছেন তখন থেকে আপনি আর আমার মত রাবড়িভাতে বাঙালির গুরু নেই, গুরুদেব হয়ে বসেছেন। গুরুদেবদের যা গতি হয়, আপনারও তাই হয়েছে। ক্রমশ গুরু বাদ গিয়ে দেব হয়ে গেছেন। মনের ঘর থেকে ঠাকুরঘরে ট্রান্সফার হয়েছে। আপনার জীবদ্দশাতেই শুরু হয়েছিল। মরার পরে আরো তাড়াতাড়ি। এবং ব্যাপারটা উদ্যোগ নিয়ে করেছে কারা? আপনার সঙ্ঘের মাথারা।“

“কিন্তু… আমি তো বিশ্বভারতী করেছিলাম সারা পৃথিবীর মানুষের সাথে ভারতের আদানপ্রদান হবে বলে!”

“সে তো আপনি। আপনিও প্রস্থান করেছেন আর আপনার ভক্তরা যথাস্থানে জাঁকিয়ে বসে আপনাকে জমিদারি বানিয়ে নিয়েছে। আপনার তৈরি জমিতে আপনার দাড়ি ছাড়া আর কিছুর চাষ ওরা বিশেষ করেনি। ওরা নিয়ম বানিয়েছিল, ওরা যেখানে আপনি আছেন বলবে, শুধু সেখানেই আপনি আছেন, অন্য কোথাও নেই। পুরীর মন্দিরের পান্ডা আর কি। আপনাকে এমন ঠুঁটো জগন্নাথ বানিয়েছে যে ডজনখানেক গান আর গোটাকুড়ি কবিতার বাইরে আপনার লেখাপত্র পড়ার সাহস আর কেউ করেনি। আমরা বাঙালিরা সব মাথায় ছোট বহরে বড়, সে তো আপনি জানেনই। আমরা মানুষকেই বেশি ঘাঁটাই না, আর ঠাকুর। আপনার সঙ্ঘ দিয়েছে আপনাকে ঠাকুর বানিয়ে। ঠাকুরকে কী করতে হয়? শিকেয় তুলে রেখে দিনে দুবার পেন্নাম ঠুকতে হয় আর পুজোর মন্তর মুখস্থ করে রাখতে হয়। তা বাঙালিরা এতকাল তাই-ই করে এসেছে আর রবীন্দ্রজয়ন্তীতে আউড়েছে। এখন আরেক সঙ্ঘ ঢুকেছে বাংলায়। তারা এসে আপনার নামে যা ইচ্ছে বলছে আর বাঙালি হাঁ করে গিলছে। কেন গিলবে না? জানেই না তো কোনটা আপনি সত্যি লিখেছেন আর কোনটা লেখেননি। সঙ্ঘ আর ভক্ত — এ দুটো জিনিস সকলের এড়িয়ে চলা উচিৎ। কিন্তু আপনি তা করেননি। তবে এ সঙ্ঘ আপনারটার চেয়ে অনেক বেশি সাঙ্ঘাতিক। এরা আপনাকে, কাজীকে, আমাদের সবাইকে বাঙালির ড্রয়িংরুম থেকে তাড়িয়ে ছাড়বে।“

“তাড়াক গে। We couldn’t care less,” ঋত্বিক বল্লে। “কিন্তু এরা যে কদিন পরে বাঙালিকেই বাংলাছাড়া করবে। সেটা বড় চিন্তার কথা। We should agitate against it.”

“কাদের নিয়ে agitate করবে শুনি?” শিব্রাম বাধা দিলে। “ঐ যারা রভিন্দরনাথ হিন্দু কবি ছিলেন শুনে হাততালি দিচ্ছিল তাদের নিয়ে? ও ব্যাটারা তো আর অবাঙালি নয়, আর ওরা সাঙ্ঘাতিক সঙ্ঘের লোকও নয়।“

“আচ্ছা, আমার সঙ্ঘ নয় বুঝলুম, কিন্তু এই নতুন সঙ্ঘটা কার?” রবি শুধোল।

“নতুন? কে বলে নতুন? এ সঙ্ঘের বয়স প্রায় একশো বছর। এরা রক্তবীজের ঝাড়। এরাই তো আপনার জনগণমনকে জাতীয় সঙ্গীত বলে মানতে চায়নি কোনদিন। তেরঙা পতাকা হিন্দুদের জাতীয় পতাকা হতে পারে না বলত। বছর কুড়ি আগে অব্দি ১৫ই আগস্টকে স্বাধীনতা দিবস বলেই মানত না।“

“ওঃ! সেই।”

রবির চোখে যে বেদনা দেখলেম সে ভাষায় বোঝানো আমার কম্ম নয়। সে খানিকক্ষণ থম মেরে বসে রইলে। তারপর নড়েচড়ে উঠে বল্লে “বাঙালি এসব হতে দিচ্ছে?”

“আঃ! গুরুদেব, আপনি যে কি ছেলেমানুষী করছেন তখন থেকে! ভেতো বাঙালি হল আমার মত। দুবেলা দুটি খেয়ে মুক্তারামের তক্তারামে থাকতে পারলেই খুশি। উদ্যোগ টুদ্যোগ যা ছিল সে পরাধীন দেশে। দেশ স্বাধীন হয়েছে সত্তর বছর হতে চলল। বাঙালি এখন টিভি বিতর্ক ছাড়া কোথাও লড়ে না। মাঝেমাঝে যমের ঘরে এসে একটু খবরের চ্যানেল দেখে যাবেন, সব জানতে পারবেন।“

“তাহলে তো কিছু একটা করতে হয় রে। শুধু নরকের রবীন্দ্রজয়ন্তী বন্ধ রাখলেই তো চলবে না,” রবি দেখি হঠাৎ খুব উত্তেজিত হয়ে উঠেচে।

“কী কত্তে চাস?” আমি শুধোলেম।

“বাংলার সব রবীন্দ্রজয়ন্তী ভেস্তে দিতে চাই। আগে আমার লেখাপত্র পড়া অভ্যেস করুক, তারপর করবে রবীন্দ্রজয়ন্তী। কিছুদিন আগেও তো শুনতাম আমার আর কাজীর জন্মদিন একসাথে রবীন্দ্র-নজরুল সন্ধ্যা নাম দিয়ে পালন হত। সেই জাতির মাথায় এখন এইসব ছাইপাঁশ ঢুকেছে। অসহ্য। চল ভেস্তে দিই সব।“

“পড়ে না যে তা নয়” ঋত্বিক চশমাটা নাকের উপর নামিয়ে এনে বল্লে। “কেবল কবিতা, গল্প, উপন্যাস এইসবই পড়ে। প্রবন্ধগুলো কোন শালা উল্টে দ্যাখে না। আর গীতবিতান, স্বরবিতান। গান গাওয়ার সময় কথাগুলো নিজের কানেও পৌঁছায় না।“

“হ্যাঁ। যত মনোযোগ স্বরলিপিতে। লিপিতে মনে নেই,” শিব্রাম বললে। “এবং এর পেছনেও গুরুদেবের সঙ্ঘের অসীম অবদান। এখন না হয় কপিরাইট নেই, সে যুগে লোককে কি হয়রান করেছে। জর্জের মত গায়ককে বলেছে ও নাকি গুরুদেবের গান গাইতে পারে না।“

শুনে রবির চোখ ছানাবড়া। “সত্যি নাকি গো, জর্জ?”

“আরে ছাড়ান দ্যান। এহন আর ওসব কথায় কী কাম?” জর্জ এড়িয়ে যেতে চায়।

“তাহলে? শুধু ভেস্তে দিলে তো চলবে না। আর কী করা যায়?” রবি চিন্তায় পড়ে।

“দাঁড়ান। এসব আমাদের বুদ্ধিতে হবে না। এক্সপার্ট লাগবে। ডাকছি,” ঋত্বিক অভয় দেয়।

শিগগির হাজির হয় নবারুণ — গোটা নরকে ঋত্বিকের সবচেয়ে ন্যাওটা ছেলে। সঙ্গে ওর অদ্ভুত চেহারার শাগরেদরা। নবারুণ নিদান দেয় ওর ফ্যাতাড়ুবাহিনী বাংলার সব রবীন্দ্রজয়ন্তীর স্টেজে মলমূত্র আবর্জনা ফেলে ভেস্তে দেবে আর ফেলে আসবে গুচ্ছ গুচ্ছ হ্যান্ডবিল। কী ছাপা থাকবে তাতে? রবির এমন কয়েকটা লেখা, যা বাঙালি পড়তে ভুলে গেছে — ‘Nationalism’, ‘ভারতবর্ষের ইতিহাস’, ‘সভ্যতার সংকট’।

আমরা সায় দিই, ওরা ফ্যাৎ ফ্যাৎ সাঁই সাঁই কত্তে কত্তে কেরী সায়েবের ছাপাখানায় রওনা দেয়, রবি আর জর্জ খুশি হয়ে গান ধরে “যেতে যেতে একলা পথে নিবেছে মোর বাতি/ঝড় এসেছে ওরে ওরে/ঝড় এসেছে ওরে এবার/ঝড়কে পেলেম সাথী।“

 

 

Screen Shot 2017-05-08 at 1.00.20 PM

Screen Shot 2017-05-08 at 1.00.36 PM

 

Sources:

  1. Book Excerpt
  2. Rabindranath – Sketch
  3. Kazi as Narad
  4. Rabindranath – Helen keller

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

w

Connecting to %s