Democracy to Democrazy!

Hutom Pecha

প্রজাতন্ত্র মানে আসলে যা, তার ঠিক উল্টোটা আপনাকে বোঝানোর জন্য সকলে মিলে উঠেপড়ে লেগেছে। প্রজাতন্ত্র দিবসের কাগজে ঢাউস ঢাউস বিজ্ঞাপন যেখানে “সত্যিকারের হিরো” দের কুর্নিশ জানানো হচ্ছে। এক বলিউডি হিরো, যিনি গদগদ দেশপ্রেমের ছবিতে সৈনিক, গোয়েন্দা ইত্যাদি সাজেন তিনি আবার সোশাল মিডিয়ায় ভিডিও পোস্ট করেছেন মৃত সেনানীদের পরিবারকে সাহায্য করার আবেদন নিয়ে। অর্থাৎ সাধারণ মানুষ যে আয়কর দেন যা থেকে সেনাবাহিনীর বেতন, পেনশনাদি চলে সেটা যথেষ্ট নয়, আমরা যারা অসামরিক নাগরিক তাদের উচিৎ সারাক্ষণ সেনাবাহিনীর প্রতি কৃতজ্ঞতায় নুয়ে থাকা এবং সদাসর্বদা যে কোন উপায়ে তাঁদের এবং তাঁদের পরিবারের জন্য দানধ্যান করা।
আসল কথাটা হল এদেশে সেনাবাহিনীর জন্য ব্যবস্থাদি যথেষ্ট ভাল কিন্তু সেই ব্যবস্থা থেকে যাতে সেনাবাহিনীর সকলে উপকৃত হয় তার জন্যে যা যা করা দরকার তা দেশের সরকার করে না। তার ফলে বাস্তবটা নীচের তলার সেনানীদের জন্য কিরকম সেটা সাম্প্রতিককালে বেশ কয়েকজন ভিডিও পোস্ট করে ফাঁস করে দিয়েছেন। তাঁদেরকে ডিসিপ্লিনের দোহাই তুলে একঘরে করা, বদলি করা — সবই হয়েছে কিন্তু সরকার বাহাদুর ভালই বুঝেছেন লোকের কাছে বেইজ্জতি হয়েছে। ও আর ও পির জন্য আন্দোলন করা অবসরপ্রাপ্ত সেনানীদের পেটানোর পরেও জনমত ম্যানেজ করা গিয়েছিল, এবারে যায়নি। অতএব বলিউডের জনপ্রিয় নায়ককে ব্যবহার কর, বহুজাতিককে ব্যবহার কর। এরা তো সরকারের কেউ নয়, অতএব লোকে চালাকিটা ধরতে পারবে না। সেই ফাঁকে প্রজাতন্ত্রে আসল হিরো যে সাধারণ ভোটার সেই সত্যটাকেও আড়াল করে সেনাবাহিনীকেই হিরো করে তোলা যাবে। রথ দেখা, কলা বেচা দুটোই হবে। ফ্যাসিস্ট সরকার বহু মুন্ডবিশিষ্ট একটা রাক্ষসের মত, যেখানে সে নেই ভাবছেন সেখানেও সে আছে।
এই বদমাইশিতে দয়া করে আসল কথাটা ভুলে যাবেন না। আমাদের দেশটা প্রজাতন্ত্র, সেনাতন্ত্র নয়। আজকের দিনটা আমার আপনার (যাঁরা সেনাবাহিনীতে আছেন তাঁদেরও, কারণ তাঁরা প্রথমত এদেশের নাগরিক) সাংবিধানিক অধিকার উদযাপন করার দিন। সেনাবাহিনী বৈদেশিক আক্রমণ থেকে দেশকে রক্ষার দায়িত্বপ্রাপ্ত। গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব সন্দেহ নেই, কিন্তু একজন পুলিশকর্মীর দায়িত্বও এর থেকে কম নয়। একজন শিক্ষকের দায়িত্বও ছোট করা যায় না। যিনি রাস্তা ঝাঁট দেওয়ার দায়িত্বে আছেন তিনি একমাস কাজ না করলে টের পাবেন ওটা কতবড় দায়িত্ব। যে নাগরিকই নিজের কাজ সততার সঙ্গে, মনোযোগ দিয়ে করেন তিনিই সত্যিকারের নায়ক। জীবনের ঝুঁকি, পরিবারের থেকে দূরে থাকার মত ব্যাপারগুলো অন্য অনেক চাকরিতেই আছে। অতএব সেনাবাহিনীকেই একমাত্র নায়ক হিসাবে চিহ্নিত করা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মিথ্যাচার।
২৬শে জানুয়ারী দিনটা এইজন্যই গুরুত্বপূর্ণ যে সদ্য স্বাধীন দেশ হিসাবে ঐদিনই আমরা ঠিক করলাম আমরা নিজেদের দ্বারাই শাসিত হব, কোন একনায়কের দ্বারা নয়, সেনাবাহিনীর দ্বারাও নয়। দেশটাকে যে আমরা এতদিন প্রজাতান্ত্রিক রাখতে পেরেছি তার জন্য আমাদের অসামরিক নেতৃত্বের যতটা কৃতিত্ব ততটাই বাহবা প্রাপ্য প্রথম দিককার সেনাপ্রধানদের। ইদানীংকালের মন্ত্রী হয়ে যাওয়া প্রাক্তন সেনাপ্রধানরা প্রকৃতপক্ষে কুলাঙ্গার।
সোশাল মিডিয়ায় বেশ কিছুদিন ধরে আপনাকে আমাকে বোঝানোর চেষ্টা চলছে যে আমাদের নাগরিক অধিকারগুলো আমাদের দিয়েছে এবং রক্ষা করছে সেনাবাহিনী। এর চেয়ে বড় মিথ্যা কমই আছে। সংবিধানের ১৪ থেকে ১৯ নম্বর অনুচ্ছেদে আমাদের নাগরিক অধিকারগুলো আছে। সেখানে প্রতিবাদের অধিকার, মতপ্রকাশের অধিকার, ধর্মের অধিকার — সবই আছে। এগুলো আমাদের সংবিধান প্রণেতাদের কীর্তি, সেনাবাহিনীর নয়। সংবিধান অনেক মোটা বই, সকলের পক্ষে পড়া সম্ভব নয়। ঐ অনুচ্ছেদগুলোকে গুগল করুন, নিজেই যাচাই করে নিন।
সংবিধানের রচয়িতা কারা? আমরা। প্রস্তাবনায় পরিষ্কার লেখা আছে “We, the people of India”. আপনি বলবেন ওসব কথার কথা। তা যে নয় তার একটা প্রমাণ দিই। স্বাধীনতার সময় সরকারের দায়িত্বে আসে জাতীয় কংগ্রেস। প্রধানমন্ত্রী হন জওহরলাল নেহরু, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বল্লভভাই প্যাটেল। কিন্তু আইনমন্ত্রী করা হয় ডঃ ভীমরাও আম্বেদকরকে, যিনি কস্মিনকালে কংগ্রেসি ছিলেন না। বরং কংগ্রেসের সবচেয়ে বড় বিরোধীদের একজন ছিলেন তিনি। শুধু নেহরু, প্যাটেল নয়, সব রাজনীতির ঊর্ধে চলে যাওয়া মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীর সবচেয়ে বড় সমালোচকদের একজন ছিলেন আম্বেদকর। তাঁকেই আইনমন্ত্রী করে সংবিধান রচনার দায়িত্ব দেওয়া হয় কারণ নেহরু, গান্ধী, প্যাটেল সকলেই মনে করতেন স্বাধীন হয়েছে ভারত, কংগ্রেস দল নয়। সুতরাং দেশটা কেমন হবে সেব্যাপারে সব মতের লোকের অবদান থাকা উচিৎ। বিজেপি সমর্থকরা একথা মানতে চাইবেন না, ব্যাপারটার মধ্যে কং-বামপন্থী অশুভ আঁতাতের গপ্প নিয়ে আসবেন। তাঁদের উদ্দেশ্যে বলি, আদবানি-বাজপেয়ীর গুরু, জনসঙ্ঘের প্রতিষ্ঠাতা শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ও সংবিধান প্রণেতাদের একজন ছিলেন।
ভাল থাকুন, জেগে থাকুন। আমাদের প্রজাতন্ত্রটাকে সেনাতন্ত্র বা ঝাড়ফুঁকতন্ত্র হতে দেবেন না !

 

Courtesy:  Photo

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s