অচেনা বাংলা

হুতোম প্যাঁচা @onnightduty

একেলে বাবু-বিবিদের রঙ্গ দেখব আর নকশা লিখে নিজের ও পরের মনোরঞ্জন করব বলে দেড় শতক পরে মর্ত্যে এসে গা ঢাকা দিয়েচি মাসখানেক হল। তা পেত্থম যে নকশাখানা লিকলেম সে দেখি বড় একটা কেউ পড়লে না, একটি ভদ্দরলোকও রিটুইট কল্লে না। কি করি? মনের দুঃখে বাংলা খাচ্ছিলেম খালাসিটোলায় বসে। এমন শস্তা দিশি মদ আমি জীবদ্দশায় কখনো খাইনি, মরণদশাতেও খেতেম না ঋত্বিক চাপাচাপি না কল্লে। ছোঁড়ার এ জিনিস এত পচন্দ যে যমের চাপরাশিগুলোকে ঘুষ দিয়ে মাঝেমধ্যেই কয়েক বোতল আনায় আমাদের নরকে। তা যেই শুনেচে আমি ইদানীং ভূত হয়ে মর্ত্যে এসে রয়েচি, আমায় ওখান থেকে ফোন করে বললে (ভাববেন না। আমাদের হ্যান্ডসেট লাগে না, মগজে টাওয়ার আচে, নাম ধরে ডাকলেই কানের ভেতর ট্রিং ট্রিং) একদিনের জন্যে আসতে চায়। কেন? না মানবদেহ ধারণ করে খালাসিটোলায় যাবে, আমার সঙ্গে দু পাত্তর খাবে। সেই বেঁচে থাকতে যেমনটা কত্ত আর কি। আমায় পরিষ্কার বলে দিলে “তোমার বাবুগিরির দিন গিয়েছে, হুতোমবাবু। তাছাড়া তুমি যে কোয়ালিটির মাল খেতে ওসব আর পাওয়াও যাবে না এখন। আজকাল সব ভেজাল, শুধু বাংলাটাই খাঁটি। তোমাকে খাইয়েই ছাড়ব, শালা বুর্জোয়া।“

সেই ১৯৭৬ থেকে দেকচি তো, জানি ছেলেটা বুর্জোয়াদের দুচক্ষে দেখতে পারে না কিন্তু আমাকে ওটা ভালবেসে ডাকে। তবে আমার একটু চিন্তা হচ্চিল যে মানুষের মাঝে যাব, কেউ যদি চিনে ফেলে ভির্মি খায়? খামোকা হার্টফেল করে মরে টরে গেলে বিশ্রী হবে। ঋত্বিককে বলতে ও পাত্তাই দিলে না। “ধুর! বাঙালি চিনবে তার ইন্টেলেকচুয়াল আইকনদের? ওদের ইন্টেলেক্ট কবে হাওয়া হয়ে গেছে। বিশেষ করে পশ্চিমবাংলার মালগুলোর। শালারা নিজেদের ইতিহাস ফিতিহাস কিস্যু জানে না। কেউ চিনবে না আমাদের। তাছাড়া কোন মিডলক্লাস প্রিটেন্ডার খালাসিটোলায় যায় না। ওটা খাঁটি প্রোলেতারিয়েতদের জায়গা, হুতোমবাবু।“ তাই এলেম চলে। অবশ্য ঋত্বিককে কেউ না বলতে সাহস করে না। যমব্যাটাও না।

তা বলে আমি স্বপ্নেও ভাবিনি ঋত্বিক আমায় এমন একখান জায়গায় নিয়ে আসবে। এজায়গায় যারা পান করতে এসেচে তাদের মাঝে আমি কালেভদ্রে গিয়েচি তবে এমন দোকানে বসে জম্মেও পান করিনি। ভাবতেছিলেম এমন জায়গায় যদি বেঁচে থাকতে আসতেম তবে আমার নকশা আরো কত রঙিন হত। শুনে ঋত্বিক বললে “মানুষ নিজের পরিবেশ তৈরি করতে পারে না, বুঝলে? কিন্তু পরিবেশকে প্রভাবিত করতে পারে এবং সেটা করার চেষ্টা করে যাওয়া উচিৎ অ্যাজ লং অ্যাজ হি লিভস। তুমি তোমার জীবনে সেইটে করেছ। তোমার লেখা তোমার সময়ের চেয়ে অনেক এগিয়ে — আমি বলব প্রোগ্রেসিভ। নট রেভোলিউশনারি, বাট প্রোগ্রেসিভ।“

এই বলে গলায় আরেক পাত্তর ঢাললে, আমিও ঢাললেম। দু তিন পাত্তরের পর থেকে আমারও বাংলা বেশ লাগছিল। তারপর আমি শুধোলেম “আমার লেখা যদি কালের চেয়ে এগিয়েই ছিল, এখন আর কেউ পড়তেচে না কেন?”

“স্কাউন্ড্রেল তাই। আমরা সবাই স্কাউন্ড্রেল। আমরা নিজের দিকে তাকাতে ভয় পাই, আমরা অস্বস্তিকর চিন্তাগুলো এড়িয়ে চলি। সেইজন্যেই তো কোন শুয়োরের বাচ্চা আমার ছবি দেখতে চাইত না, কেউ আমার ছবির জন্যে টাকা দিত না। মানুষকে সময় দাও, ঠিক পড়বে। শুধু লিখে যাও। তুমি থাকবে না, তোমার লেখাগুলো থাকবে।“

বাংলার ঝাঁজে না ঋত্বিকের কথার ঝাঁজে কে জানে, আমি ভাবতে শুরু করলেম পরের নকশাটা কী নিয়ে লেখা যায়। কিন্তু ও ভাবতে দিলে তো। কতা নেই বাত্তা নেই, বলে “চল হুতোমবাবু, একটু হাওয়া খেতে খেতে হাঁটা যাক আর ভাবা প্র্যাকটিস করা যাক। দেখি কলকাতাটা কতটা ক্ষয়ে গেছে। দেখাই যাক বড়লোকগুলো কতটা অসভ্যের মত বড়লোক হয়েছে আর গরীবগুলো কতটা কুত্তার বাচ্চার মত বেঁচে আছে।“

আমরা হাঁটতে শুরু কল্লেম। ও আমার চেয়ে ৮৫ বছরের ছোট বলে রাস্তাঘাট ওরই বেশি চেনা, তা বাদেও ওর পথ ও নিজেই ঠিক করে সবসময়। আমি তাই চুপচাপ ঋত্বিকের দেখানো পথেই চল্লেম।

সবে হিন্দু কালেজ পেরিয়েচি এমন সময় দেখি অবাক কান্ড — হিন্দু কি হেয়ার ইস্কুলে পড়বার মত কচি কচি ছেলেরা আমাদের দিকে হেঁটে আসচে। কপালে গেরুয়া পট্টি আর হাতে যতরাজ্যের ধারালো অস্তর। মুখে আবার বাণী। কী বাণী? না “জয় শ্রীরাম।“ কচিগুলার সঙ্গে দেখি ধেড়েও কম নেই।

আমি তো থ, ভাবলেম ঋত্বিক বুঝি জানে এসব কী ব্যাপার। ওমা! তার দিকে তাকিয়ে দেখি সে-ও হাবার মত চেয়ে চেয়ে দেকচে। ঝোলা থেকে বাংলার ছিপিছাড়া বোতলটা বের করে খেলে এক ঢোঁক, তারপর আমায় শুধোলে “এই রামটা কি কোন নেতাটেতা নাকি? সামনে কোন ইলেকশন আছে?” বোঝ! ও সেদিনকার ছেলে ও-ই জানে না আর আমি জানব? যা হোক, ততক্ষণে মিছিলের লেজটা দেখা গেচে, ভাবচি এরা চলে গেলেই এগুব। ও বাবা! সেটি হচ্চে না। দেখি লেজের দিক থেকে আরেক নতুন মিছিল শুরু হয়েচে — বীরাঙ্গনা বউ-ঝিদের মিছিল। একইরকম সাজসজ্জা আর অস্তরের ঝিলিক। দেখে আমি বল্লেম “এ রাম লোকটা যদি সত্যি নেতা হয়, তালে খুবই প্রিয় নেতা লোকের। নাকি সেনার কোন বড় কত্তা? এ তো একখান ছোটখাটো মিলিটারিই দেখচি। নয়?”

“দাঁড়াও, আজ ফিরি নরকে। ঐ ইস্ট বেঙ্গলের ছোঁড়াগুলোকে আমি দেখাব মজা” ঋত্বিক হঠাৎ মহা ক্ষেপে গিয়ে বল্লে। “শালা জোয়ান ছেলেপুলে। এদিকে একটা যুদ্ধ লেগেছে ওরা জানেই না! একটিবারও বলেনি। আমি জানতাম বাংলায় শেষ যুদ্ধ হয়েছে সেই নাইন্টিন সেভেন্টি ওয়ানে।“

“কিন্তু এ বা কেমন যুদ্ধ? কে কার সাথে লড়চে কিচুই তো টের পেলুম না। আবার কলিকাতার রাস্তায় যুদ্ধ?”

“অদ্ভুত ঠিকই তবে আমার জীবনে যে দেখিনি সেটা তা বলব না। নাইন্টিন ফর্টি সিক্স। মুসলিম লিগের প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবস। পরিষ্কার মনে আছে আমার। আরে! দাঁড়াও, দাঁড়াও।” ঋত্বিকের চোখগুলো দেখি জ্বলে উঠেচে।

“আচ্ছা, এ সেই রাস্কেলগুলোই নয় তো?” আমায় শুধিয়ে আবার নিজেই বলে “নাঃ। মুসলিম লিগ এরা নয়। কোন সবুজ পতাকা তো দেখলাম না! চাঁদ তারাও ছিল না। ছিল?”

আমিও দেখিনি। তাজ্জব ব্যাপার বটে! আমাদের দুইজনের দেড়শো বছরের স্মৃতিতে নাই কলিকাতায় “জয় শ্রীরাম” বলে অস্তরশস্তর নিয়ে মিছিল। আমাদের আর হাঁটার সাধ ছিল না। ঋত্বিক তো বল্লে তখুনি নরকে গিয়ে অভিজিৎকে জিগেস করা উচিৎ “ছাতার কম্পিউটারটা দিয়ে করে কি যদি মর্ত্যে কী হচ্ছে না হচ্ছে তা-ই না জানে?” আমি বলতে যাচ্চিলেম যে অভিজিতের দোষ নেই, ওর ল্যাপটপ তো আমার কাচে। তার আগেই আমার মাথার মধ্যে ট্রিং ট্রিং। শুনি মধুদার গলা, নরক থেকে ফোন কচ্চে।

“হুতোম, তুমি তো আমার কলেজের সামনে?”

“আজ্ঞে।“

“কী ব্যাপার ওখানে? ঠিক গেটের সামনেটায় কারা সব ঐ কাওয়ার্ডটার নাম করছে শুনতে পেলাম? এত জোরে চেঁচাচ্ছিল যে এখান থেকে পর্যন্ত স্পষ্ট শোনা যাচ্ছিল।“

“কাওয়ার্ড? ও! আপনি রামের কতা বলচেন। না না, এ আপনার রাম নয়। এই রাম তো কে এক যোদ্ধা। তার ভক্তরা খুব হিংস্র। এইমাত্র আমি আর ঋত্বিক নিজের চোখে দেখেচি। ছোট ছোট মেয়েরা পর্যন্ত হাতে তলোয়ার নিয়ে যাচ্চে। এদের রাম আপনার রাম হতেই পারে না, মধুদা।“

“আমেন,” মধুদা নিশ্চিন্ত হয়ে বললেন। “আমার কলেজের সামনে রামনাম হচ্ছে শুনলেই গা ঘিনঘিন করে। কখনো যদি এ জিনিস হয় না, আমি ভ্যাম্পায়ার হয়ে মর্ত্যে যাওয়ার জন্যে অ্যাপ্লাই করব, এই বলে দিলাম।“

ঋত্বিক সবই শুনতে পাচ্ছিল। বল্লে “আরে দাঁড়ান, মধুদা। আপনি বড্ড তাড়াতাড়ি রেগে যান। এইজন্যেই বলি মাঝেমধ্যে আমার সঙ্গে খালাসিটোলা আসুন, খাঁটি বাংলা খান। মাথা ঠান্ডা হবে। যা-ই হোক, আমরা এক্ষুণি আসছি। অভিজিৎ এন্ড কোম্পানিকে জিজ্ঞেস করতে হবে ব্যাপারটা সম্পর্কে ওরা কী জানে।“

নরকে পৌঁচে দেখি অভিজিৎ আর তার সাঙ্গোপাঙ্গ হাওয়া, ব্যাটা যম কিছুতেই বলবে না ওরা গেল কোথায়। শেষে ঋত্বিক ব্যাটার ধুতির কাছা ধরে এক টান মেরে বল্লে “মুখ খোল শালা, নইলে পুরো বাংলার বোতল তোর মুখে খালি করব। এমন কড়া যে অনন্তকালের বাকিটাতেও হজম করে উঠতে পারবি না।“ ওতে কাজ হল। শুনলেম অভিজিৎরা গেচে কোন বাঙালি কবির বাড়ি পীরেত হয়ে পাহারা দিতে। সে বেচারাকে নাকি কোন সব মৌলবাদী খুনের হুমকি দিচ্চে। তো আমাদের এরা কবে ফিরবে কোন ঠিক নেই।

ঋত্বিক তো রেগে কাঁই। “শালা, তুমি তোমার লোকেদের কাজগুলো ঐ ব্রাইট ছেলেগুলোকে দিয়ে করাচ্ছ?” যম কাঁচুমাচু হয়ে বল্লে যে কাউকে খুনীর হাত থেকে রক্ষা করে মোটেও ওর দলবলের কাজ নয়, খুন হয়ে গেলে দেহখানা নিয়ে আসাই ওদের কাজ। অভিজিৎ নিজেই এ কাজটা কত্তে চেয়েচে, তা কি করা?

আমরা পড়লেম ফাঁপরে। কি করে কিছু জানা যায়? আমার মনে পড়ল কবি কৃত্তিবাসের কতা। তেনার রামের নাম কচ্চিল না তো ঐ বাঁদরগুলো? তেনার কাচে একবার খোঁজ কল্লে হয়। কিন্তু সেজন্যে আবার স্বর্গে গিয়ে দেখা কত্তে হবে। যম অ্যাপয়েন্টমেন্ট না করে দিলে সে হবার যো নেই। তা সেটা ঋত্বিকের চোকরাঙানির চোটে যম দু মিনিটেই করে দিলে।

আমরা গিয়ে স্বর্গের ভিজিটার্স রুমে বসেচি, দরোয়ানটি এসে জানালে অপেক্ষা করতে হবে বেশ খানিক। কৃত্তিবাস তুলসীদাস আর বাল্মীকির সঙ্গে মিলে পুজো কচ্চেন।

“তিন রামায়ণ রচয়িতা মিলে কি পুজো, বাবা?” আমি শুধোলেম।

দরোয়ানজি যারপরনাই রেগে উঠে বল্লেন “আপনেরা কি মেলেচ্ছ না নাস্তিক? আজ রামনবমী জানেন না?”

“হুতোমবাবুর কথা জানি না, তবে হ্যাঁ, আমি পাক্কা নাস্তিক। আর আমরা তো নরকের কীট। আমাদের ভগবানের খবর নিয়ে হবেটা কী?” ঋত্বিক একেবারে হাঁকড়ে দিলে বেচারাকে।

অনেকক্ষণ অপেক্ষার পরে কৃত্তিবাস এলেন। আমরা বল্লেম যা যা দেখেচি, শুনেচি। তারপর যেই না জিগেস করা যে এরা ওনার রামেরই নাম কচ্চিল কিনা, সে যা রেগে গেলেন। “শোন, আমার রাম নরম মনের মানুষ। বউকে, ভাইকে ভালবাসেন। সীতার দুঃখে কাঁদেন। তিনি কখনো বানরসেনাকে বলতেন না এইভাবে রাস্তাঘাটে নিরীহ লোকেদের শক্তি দেখাতে। ছোঃ! আর শিশুদের হাতে অস্ত্র? কক্ষনো না। ছি ছি ছি। তাঁকে তোরা এইসব বদনাম দিচ্ছিস। ভয়ডর নেই রে, অ্যাঁ?”

আমি হাতজোড় করে বল্লেম “ক্ষমা করে দেন। আমরা কেবল ঐ মিছিলের আরাধ্য রামকে খুঁজে বের করার চেষ্টা কচ্চি। আর কোন উদ্দেশ্য নেই। রামের দিব্যি।“

ওনার দয়ার শরীর, কল্লেন ক্ষমা। আমরা তখন সাহস করে বল্লেম “একবার তুলসীদাসজি আর আদিকবি বাল্মীকির সাথে দেখা হয়?” তা উনি ব্যবস্থা করে দিলেন।

আমরা তুলসীদাসকে একই প্রশ্ন কত্তে তিনি তো এই মারেন কি সেই মারেন। “তোরা রামচরিতমানস পড়িসনি, হতভাগা? ভগবান রাম একজন বিরাট বীর। তাঁর শিশু আর মহিলাদের যুদ্ধে নামাতে লাগে না। বরং তাঁকে যারা ভালবাসে তাদের জন্যে তিনি সব করতে পারেন। জানিস না তিনি চারটে হাত আর আরো সব দৈবশক্তি নিয়ে জন্মেছিলেন কিন্তু মা কৌশল্যার স্নেহ চরিতার্থ করতে সেসব ছেড়ে সামান্য শিশুর রূপ ধারণ করেন? তার নামে বলছিস তিনি শিশুদের হাতে অস্ত্র তুলে দিয়েছেন! তোদের সর্বনাশ হবে।“

উনি রেগেমেগে আমাদের ক্ষমা চাইবার সুযোগও না দিয়ে প্রস্থান কল্লেন। ঋত্বিক অবশ্যি ক্ষমাটমা চাইত না। ওর ততক্ষণে আর উৎসাহ নেই, বলচে “চল, কেটে পড়ি। লাভ নেই।“ আমি অনেক বুঝিয়েসুজিয়ে বাল্মীকির জন্যে বসিয়ে রাখলেম।

মহর্ষি তো আমাদের কথা শুনে রীতিমত অপমানিত বোধ কল্লেন। রাগলেন কম, কষ্ট পেলেন বেশি। “তোরা অবিশ্বাসীরা বড় প্যাঁচালো মনের লোক,” তিনি বল্লেন। “আমি প্রথম জীবনে দস্যু ছিলাম বলেই তোরা এসব বলছিস আমায়।“ আমি বলতে গেলেম যে সেসব কিছু নয় কিন্তু উনি মানবেনই না। চোখের জল ফেলতে ফেলতে বল্লেন “বোকা বানানোর চেষ্টা করিস না, বাপ। আমি জানি, তোরা বিশ্বাসই করিস না যে ভগবত প্রেমে মানুষ বদলাতে পারে। শোন, আমি শুধু বসে বসে বানিয়ে বানিয়ে রামায়ণ লিখিনি রে। আমি তাঁকে নিজের মধ্যে অনুভব করেছি। অযোধ্যা কোথায় জানিস? আমার বুকের ভেতরে। রাম ছিলেন শ্রেষ্ঠ নরপতি। যাকে বলে রাজার রাজা। তেমন রাজা কখনো শ্যাম, যদু, মধুকে অস্ত্র নিয়ে রাস্তাঘাটে ঘুরে বেড়াতে দেন না। তোদের ঐ খুনেগুলো কখনো আমার রামের ভক্ত হতে পারে না।“

কেউ ঐ রামের হদিশ দিতে পাল্লে না বলে ঋত্বিক এত হতাশ হলে যে নরকে ফেরার পথেই ঝোলায় যে বোতলটা ছিল সেটা খতম করে ফেল্লে। আমিও চিন্তায় পল্লেম। আমায় কিনা লোকে বলত ক্ষণজন্মা, বিদ্যাসাগর মশায়ের মত লোকের আমার জ্ঞানে বিশ্বাস ছিল, মাত্তর তিরিশ বছরের জীবনে আমি মহাভারত অনুবাদ করেচি বাংলায় — সেই আমি কিনা জানতেমই না বাংলায় অমন এক জঙ্গি দেবতা আচেন! যদি সে দেবতার জন্ম আমার মৃত্যুর পরে হত তালেও তো মধুদা জানত। নইলে ঋত্বিকের মত ছেলে তো জানতই। নইলে স্বর্গের বাঙালিরা তো জানত। জানলে কৃত্তিবাসও জানতেন। বল্লেন না তো কিছু! অমন একজন জনপ্রিয় জঙ্গি দেবতা আমাদের কয়েকশো বছরের স্মৃতিতে ধরাই পড়েনি!

নরকে এসে একটু বিশ্রাম নিয়ে সবে মর্ত্যে ফেরার জন্যে উঠতে যাচ্চি এমন সময় ঋত্বিক আমার পিলে চমকে দিয়ে চেঁচিয়ে উঠলে “ইউরেকা”। তারপরেই আমার হাত ধরে টানতে শুরু কল্লে। কিছু বোঝবার আগেই দেখি আমরা আমাদের চুপচাপ প্রতিভাবানটির ঘরে। মানে সুকুমার আর কি। সে আপন মনে কিছু একটা আঁকছিল, ঋত্বিক সেসবের তোয়াক্কা না করে সোজা শুধোল “কাকু, আপনি রাম-রাবণের যুদ্ধ নিয়ে সেই কি যেন নাটকটা লিখেছিলেন? আঃ! এত ভুলে যাই আজকাল। কী ছিল নামটা?”

সুকুমার তার দুষ্টু হাসিটা হেসে বল্লে “ঋত্বিক, তোকে কতবার বলেছি, তুই বড্ড বেশি খাচ্ছিস। অত খেলে কি আর মাথা কাজ করে রে? নাটকটার নাম ‘লক্ষ্মণের শক্তিশেল।“

“ঠিক, ঠিক,” ঋত্বিক আমায় বল্লে “ওটা সুকুমারকাকুর সেরা কাজগুলোর একটা। তুমি অবশ্যই পোড়, হুতোমবাবু। ওখানে রামের সেনাবাহিনীটা হাস্যকর অ্যামেচারদের। আমরা যে আর্মিটা দেখলাম সেটাও তো তাই, কি বল? তার মানে ওরা সুকুমারকাকুর রামের নামই করছিল।“

“কোন আর্মি?” সুকুমার জানতে চাইলে। “আমাদের কলেজের সামনে দিয়ে আজ যারা গেছে? মাইকেল বলছিলেন। ঋত্বিক, তুই ঠিক ধরতে পারিসনি। ওরা আমার রামের ভক্ত হতে পারে না। আমার রাম যুদ্ধ করতে একদম পছন্দ করত না। তোর হয়ত মনে নেই, সে কিন্তু সারাক্ষণ রাবণের সাথে যুদ্ধটা এড়াতে চাইছিল। কিন্তু মাইকেল তো বললেন এই উল্লুকগুলো নাকি লড়াই করার জন্যে উসখুস করছিল। আর তাছাড়া অত লোক আমার নাটকটা পড়েছে এ তুই আমায় বিশ্বাস করতে বলিস? ঋতুটিতু সেদিনের ছেলে, ওদের কাছে শুনিসনি আজকাল বাংলা বই কেউ পড়ে না?”

যদিও নাটকটা আমারও পড়া নয় তবু বুঝলাম সুকুমার কথাটা ঠিকই বলেচে। ঋত্বিকও বুঝল। শরীরটা সুকুমারের আঁকার খাতাটার উপরেই ছেড়ে দিয়ে বিড়বিড় করে বল্লে “হুতোমবাবু, হাল ছেড়ে দিলাম।“

আমিও দিলাম। এখন অভিজিৎ, নীলয়, অনন্ত ওদের ফেরা অব্দি অপেক্ষা কত্তেই হবে। ইতোমধ্যে আপনারা কেউ যদি এই অচেনা রামের ব্যাপারে কিছু জানতে পারেন তো আমায় জানাবেন।

 

Photo : Ram Navami

4 thoughts on “অচেনা বাংলা

  1. Exceptionally brilliant! Jharjhare Bangla. Ashadharon dakhol bhashar opor. Colloquial as well as shuddha bhasha. Bhabtei parchhina, ei gen er chhele eto chamatkar katha bolts paare! Lucid, easy flow, coinage of words is wonderful! Why he is in disguise? High voltage writing! My blessings to him forever. He/ she should open his/ her innings in a 1st class newspaper house or free lancing.
    Great! Bravo! Go ahead with your realization, power (power of writing & imagination)

    Like

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

w

Connecting to %s